ঢাকা বাসযোগ্য হবে কবে?

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বে বাসযোগ্য ১৪০টি নগরের তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিু স্থানে রয়েছে (১৩৯তম)। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইইইউ) বার্ষিক বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক ২০১৮-এর প্রতিবেদনে গত ১৪ আগস্ট এ তথ্য জানা যায়।

সূচকে ঢাকার পরে রয়েছে শুধু গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। কিন্তু ঢাকায় যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো সমস্যা না থাকলেও প্রতিটি মানদণ্ডেই আমাদের ঢাকা খারাপ স্কোর করেছে। আর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা এবার বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য নগরের মর্যাদা লাভ করেছে।

ইইইউ প্রতিবছরই স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো- এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক’ তৈরি করে।

এই মানদণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো ঘটনায় চরম অস্থিতিশীলতার ফলে দামেস্ক সর্বনিুে অবস্থান করছে। আর স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণেই মূলত বেশি পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা।

ইইইউ স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোর মতো পাঁচটি বৃহৎ মানদণ্ড সামনে রেখে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩০টি গুণগত ও পরিমাণগত সুযোগ-সুবিধা যাচাই-বাছাই করে। এ জন্য প্রতিটি শহরের জন্য ধরা হয় সর্বমোট স্কোর ১০০। প্রতিটি মানদণ্ডের জন্যও পৃথকভাবে ১০০ স্কোর নির্ধারণ করা হয়।

আবার প্রতিটি মানদণ্ডকেই ‘গ্রহণযোগ্য, সহনীয়, অস্বস্তিকর, অবাঞ্ছনীয় ও অসহনীয়- এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। সূচক প্রতিবেদনে দেখা গেছে- সর্বমোট ১০০ স্কোরের বিপরীতে ঢাকা পেয়েছে ৩০ পয়েন্ট। এর মধ্যে স্থিতিশীলতায় ঢাকার পয়েন্ট ৫০, স্বাস্থ্যসেবায় ২৯.২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪০.৫, শিক্ষায় ৪১.৭ এবং অবকাঠামোয় ঢাকা পেয়েছে ২৬.৮ পয়েন্ট।

ইইইউর প্রতিবেদনে বিগত বছরগুলোয়ও ঢাকার অবস্থান চলতি বছরের ন্যায় খারাপ অবস্থানে বিরাজ করতে দেখা গেছে। গত বছরও ঢাকার অবস্থান খারাপ ছিল। ২০১৫ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের জরিপে সারা বিশ্বে বসবাসের জন্য সবচেয়ে অনুপযোগী (দ্বিতীয়) শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল ঢাকা। ২০১৪ সালে বসবাসের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে অযোগ্য শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এ ধরনের খবরগুলো ঢাকাবাসী তথা এ দেশবাসীর জন্য নিশ্চয় ভালো কোনো খবর নয়। বরং তা উদ্বেগের এবং নিরানন্দের। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকার এ অবস্থানের মূল কারণ ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতি। ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতির বিষয়টি আজ হতে বহুকাল পূর্বেই হয়তো গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন- ‘ভাইসব, তোমরা প্রাচুর্য, সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রত্যেকটি ইট, পাথর উল্টিয়ে আছড়ে দেখছ; কিন্তু যাদের জন্য তোমাদের সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য কতটুকু সঠিক পরিকল্পিত নগরায়ণ করেছ!’ ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতির দিকে তাকালে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথার শতভাগ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, সুনামি ইত্যাদির ওপর কারও হাত নেই এবং তা রোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটু সচেতন হলে জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ, অপরিকল্পিত ফ্যাক্টরি-কারখানা নির্মাণ করে একটি শহরের ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করা; একটি শহরকে জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত করা; এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো একটি শহরকে পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেয়া; একই রাস্তা অসৎ উদ্দেশ্যে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা; যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে দুর্গন্ধময় পরিবেশ তৈরি করা; যানজট, ধুলা-বালি, ধোঁয়া আর মশার উপদ্রবকে জনগণের নিত্যসঙ্গী বানানো; জনগণের চলাচলের রাস্তার ওপর হাটবাজার বসানো; পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট ইত্যাদির ভোগান্তি থেকে শহরবাসীকে তো অন্ততপক্ষে রক্ষা করা যেতে পারে। নাকি সেগুলোও পারা যায় না?

ঢাকাকে আতঙ্কিত ও অপ্রস্তুত শহর হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও কম হয় না। কিন্তু বিষয়টি যেন ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে’- এ অবস্থার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ ও যানজটমুক্ত করতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নিত্যনতুন পরিকল্পনাও নেয়া হয়। এসব নিয়ে প্রায়ই সভা-সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেসব পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

ইইইউর গত কয়েক বছরের জরিপ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট আর তা হচ্ছে- ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণ টেকসই নয়, যা প্রত্যেক সচেতন নগরবাসীই উপলব্ধি করতে পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমরা এত পিছিয়ে? স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অবস্থা তো ভালোই। ঢাকায় নেই কোনো সামরিক যুদ্ধের হুমকি বা বড় ধরনের সহিংস অপরাধের উপস্থিতি, নেই কোনো সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড, ঢাকার প্রতি পশ্চিমাদের নেই তেমন কোনো বিদ্বেষ। এখানে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধনী দেশগুলোর মতো না হলেও একবারে যে অপ্রতুল, তা কিন্তু নয়। কিন্তু পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, তা ঢাকায় নেই।

প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, জনগণ কর্তৃক ট্রাফিক আইন না মানার পাশাপাশি সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাবে ঢাকার রাস্তাঘাটে নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। যানজটের কারণে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ। ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য সামান্যতম যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত, সেটুকুও নেই। যতটুকু আছে- সেখানেও হকাররা পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের ‘ম্যানেজ’ করে বসায় হাট-বাজার, দোকানপাট। ঢাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এখানে বড় আকারের অঘটন ঘটলে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তা হবে অকল্পনীয়।

শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির কারণে ওই অংশে টিউমার, গোদ রোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ যেমন স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়, ঠিক তেমনিভাবে ঢাকার ওপর নানাদিক থেকে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ যেন টিউমার, গোদ রোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতোই অবস্থা, যা ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন

নীতিরই প্রতিচ্ছবি।

রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুলস ফর ডায়াগনসিস অব আরবান এরিয়াসের জরিপে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ঢাকার প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার পাকা ভবনের মধ্যে ৭২ হাজার ভূমিকম্প ঝুঁকি মধ্যে আছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে ২৫ কিলোমিটার বিস্তৃত ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিলেন ৩ লক্ষাধিক মানুষ। গৃহহীন হয়েছিলেন ১০ লক্ষাধিক এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস, অ্যাসেম্বেলি বিল্ডিং, প্রিন্স ক্যাথেডাল ও মেইন জেলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। দেশের বিপুলসংখ্যক জনগণ কর্মসংস্থানের জন্য রাজধানীমুখী হওয়ায় এ সংখ্যা প্রতিদিনই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ঢাকার ওপর বর্তমানে জনসংখ্যার চাপ যে হারে বাড়ছে, তাতে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকায় হলে এবং তা রিখটার স্কেলে ৭ কিংবা তার একটু ওপরের মাত্রার হলেই ঢাকা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ ঘটলে বাড়িঘর, অফিস-আদালত, ফ্যাক্টরি, শিল্পকারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে এবং পানি ও গ্যাসের পাইপলাইন ফেটে গেলে যে কী ভয়াবহ অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ এখন অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। বাস্তবে কতটুকু পরিষ্কার হয়েছে, তা সচেতন ব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন। ঢাকাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ইতঃপূর্বে বলেছিলেন, ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে প্রত্যেককে মেয়রের ভূমিকা পালন করতে হবে। ঢাকাকে বসবাসের একটি যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সবাই মিলে ঢাকাকে নিজের ঘরের মতো সাজানোরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পক্ষ থেকেও এ ধরনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করাসহ নানা কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে- যা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এসব বক্তব্য ও পরিষ্কারকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঢাকাকে পরিষ্কার রাখাসহ এটিকে বসবাসের যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু শুধু মেয়রের পক্ষে কি ঢাকাকে পরিষ্কার রাখা ও বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব? নিশ্চয় না। তাই ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করে তোলার জন্য নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ কতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম, সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা আবশ্যক; যেন সত্যিকার অর্থেই বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা। এ জন্য আমাদের প্রত্যেককেই এসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি মেয়রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কাজ শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

kekbabu@yahoo.com

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
error: Content is protected !!